ভক্তিজীবন গ্রহণ করাই যদি মনুষ্য-জন্মের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়, তবে এই যুগের অধিকাংশ মানুষ কেন ভক্ত হতে চায় না?
🍁🌿ভক্তিজীবন গ্রহণ করাই যদি মনুষ্য-জন্মের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়, তবে এই যুগের অধিকাংশ মানুষ কেন ভক্ত হতে চায় না?
উত্তর: কলিযুগের মানুষেরা সহজে ভক্তিজীবন গ্রহণ করতে চায় না। কারণ তারা পাপাচারী, ভাগ্যহীন, দুষ্কৃতকারী, ক্ষীণবুদ্ধি, কলহপ্রিয়। কলিবদ্ধ জীবের এই সকল দোষ শ্রীমদ্ভাগবতে উল্লেখ করা হয়েছে।
যাঁরা ধার্মিক, যাঁরা পুণ্যকর্ম করে নিষ্পাপ হয়েছেন, তাঁরাই ভগবানের ভজনা করতে পারেন। শ্রীকৃষ্ণ উল্লেখ করেছেন-
যেষাং ত্বন্তগতং পাপং জনানাং পুণ্যকর্মণাম্।
তে দ্বন্দ্বমোহনিমুক্তা ভজন্তে মাং দৃঢ়ব্রতাঃ ॥
"যে সমস্ত পুণ্যবান ব্যক্তির পাপ সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হয়েছে এবং যাঁরা দ্বন্দ্ব ও মোহ থেকে মুক্ত হয়েছেন, তাঁরা দৃঢ় নিষ্ঠার সঙ্গে আমার ভজনা করেন।” (গীতা ৭/৮)
ভাগ্যবান না হলে কেউ ভক্তিজীবনে উন্নীত হয় না। শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু বলছেন-
ব্রহ্মাণ্ড ভ্রমিতে কোন ভাগ্যবান জীব।
গুরু-কৃষ্ণ-প্রসাদে পায় ভক্তিলতা-বীজ ॥
"জীব তার কর্ম অনুসারে ব্রহ্মাণ্ডে ভ্রমণ করে। কখনও সে উচ্চতর লোকে উন্নীত হয় এবং কখনও সে নিম্নতর লোকে অধঃপতিত হয়। এইভাবে ভ্রমণরত অসংখ্য জীবের মধ্যে কদাচিৎ কোন একটি জীব তার অসীম সৌভাগ্যের ফলে শ্রীকৃষ্ণের কৃপায়, সদ্গুরুর সান্নিধ্য লাভ করে। এইভাবে গুরুদেব ও শ্রীকৃষ্ণ উভয়ের কৃপার প্রভাবে জীব ভক্তিলতার বীজ প্রাপ্ত হয়।” (চৈঃ চঃ মধ্য ১৯/১৫১)
দুষ্কৃতকারীরা ভক্ত হয় না। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন-
ন মাং দুষ্কৃতিনো মূঢ়াঃ প্রপদ্যন্তে নরাধমাঃ।
মায়য়াপহৃতজ্ঞানা আসুরং ভাবমাশ্রিতাঃ ॥
"মূঢ়, নরাধম, মায়ার দ্বারা যাদের জ্ঞান অপহৃত হয়েছে এবং যারা আসুরিকভাবাপন্ন, সেই সমস্ত দুষ্কৃতকারীরা কখনও আমার শরণাগত হয় না।" (গীতা ৭/১৫)
এখানে 'মূঢ়' বলতে তাদের বলা হয়েছে যারা উদরপূর্তি ও যৌনতর্পণের জন্যই দিনরাত গাধার মতো পরিশ্রম করছে। এছাড়া তাদের আর কোনও বুদ্ধি নেই। 'নরাধম' বলতে বোঝায় নরদেহ লাভ করেও অধম বা নীচবৃত্তিতে অভ্যস্ত। তারা এমন কি সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে গণ্যমান্য হলেও ধর্মীয় বিধিনিষেধ দ্বারা পরিচালিত হয় না। তারা হিংস্র প্রাণীর মতো অন্য প্রাণীদের হত্যা করে তার রক্ত মাংস হাড় ভক্ষণ করে, শেয়াল শকুনির মতো মৃত দেহ খাওয়ার জন্য তারা লালায়িত হয়। কুকুরের মতো তারা প্রতিবেশীদের সঙ্গে ঝগড়া বাধিয়ে রাখে। 'মায়য়াপহৃতজ্ঞান' বলতে বোঝায় মায়ার প্রভাবে যাদের পাণ্ডিত্যপূর্ণ জ্ঞান অপহৃত হয়েছে। তারা বড় বড় দার্শনিক, কবি, বৈজ্ঞানিক, সাহিত্যিক, নেতা হলেও মায়াশক্তি দ্বারা বিপথগামী হওয়ার ফলে তারা পরমেশ্বর ভগবানকে অবজ্ঞা করে থাকে। চতুর্থ নম্বর দুষ্কৃতকারী হচ্ছে 'অসুরভাবাপন্ন' ব্যক্তি। তারা নির্লজ্জভাবে নাস্তিক। তারা তর্কযুক্তির বড়াই করে বসে। কিন্তু তাদের সমস্ত কথা যুক্তিভিত্তিহীন হলেও তারা জোর দিয়ে ভক্ত ও ভগবানের নিন্দামন্দ করতে থাকে। এই চার ধরনের দুষ্কৃতকারীরা ভক্তিজীবন গ্রহণ করে না।
সুকৃতিবান ব্যক্তিই ভক্ত হয় পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন-ভজন্তে মাং জনাঃ সুকৃতিনঃ (গীতা ৭/১৬) "পুণ্যকর্মা বা সুকৃতিসম্পন্ন ব্যক্তিরা আমার ভজন করে।" ক্ষীণবুদ্ধি ব্যক্তিরা ভক্তিজীবন গ্রহণ করে না। একমাত্র সুমেধাসম্পন্ন ব্যক্তিরাই ভগবদ্ভজনে নিযুক্ত হন। যজন্তি হি সুমেধসঃ (শ্রীমদ্ভাগবত ১১/৫/৩২)।
জাগতিক দ্বন্দ্ব ও মোহগ্রস্ত ব্যক্তিরা ভক্ত হয় না। দ্বন্দ্বমোহনিমুক্তা ভজন্তে মাং দৃঢ়ব্রতা (গীতা ৭/২৮)-
"তাঁরাই দৃঢ় নিষ্ঠা সহকারে কৃষ্ণভজন করেন যাঁরা দ্বন্দ্ব ও মোহ থেকে মুক্ত হয়েছেন।"
.jpeg)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন